বাজার থেকে পথে নেমে এলাম আমরা। পথে নেমেই, ওর ব্যাগটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো তৃষ্ণা। ব্যাগটা নিলাম আমি। কাকীমা তৃষ্ণার দিকে চেয়ে বললেন-
'একি, ওর হাতে দুটো ভারী ব্যাগ! তুই না পারলে, বাপিকে দে।'
তৃষ্ণা বললো-
'ওর কাছে এগুলো কিছু নয় মা।'
কথাটা বলেই, আমার বাহুর পেশী ছুঁয়ে দেখলো ও। তারপর ওর মায়ের উদ্দেশে ও বললো-
'দেখছো না, কেমন বড় বড় বাইসেপ্স হয়েছে ওর! '
কাকীমা বললেন-
'ধুস, ও বাড়ির জামাই। আর ওকে দিয়ে তুই ব্যাগ বওয়াচ্ছিস?
দুষ্টু হাসি হেসে তৃষ্ণা ওর মাকে বললো-
'কেন বইবে না? '
একটু থেমে কাকীমাকে ও জিজ্ঞেস করলো-
'পুরুষরা মেয়েদের চেয়ে শক্ত কেন হয় জানো? '
কাকীমা তৃষ্ণার দুষ্টুমির সংকেত পেলেন। গম্ভীর সুরে উনি তৃষ্ণাকে বললেন-
'রাস্তায় দাঁড়িয়ে শয়তানি করিস না, তৃষ্ণা! '
কিন্তু তৃষ্ণা তাতে একটুও দমলো না। ও বললো-
'পুরুষরা মেয়েদের চেয়ে শক্ত হয়, সংসারের ভারী ভারী বোঝা বওয়ার জন্য।'
আমরা সবাই হেসে উঠলাম। এমনকি মাও হেসে উঠলো। কাকীমা মাকে বললেন-
'ওকে এমনি করে আস্করা দিও না দিদি। এমনিতেই বড় দুষ্টু ও।'
কাকীমা কথা শেষ করার আগেই, মায়ের হাত ধরে একটা মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়ালো তৃষ্ণা। তারপর ওর বাবার উদ্দেশে ও জিজ্ঞেস করলো-
'বাপি, এখানে ঢুকি আমরা? '
কাকু হাসলেন। তারপর সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন উনি।
মিষ্টির দোকানে ঢুকলাম আমরা। দোকানে ঢুকে, তৃষ্ণা মাকে জিজ্ঞেস করলো-
'জেঠিমা, কি খাবেন আপনি? '
কাকীমা জিজ্ঞেস করলেন-
'কিন্তু মিষ্টিটা খাওয়াবে কে? '
তৃষ্ণা
'কেন? আমি খাওয়াবো।'
কাকীমা
'কোন সুখে? তোর চাকরির জন্য? '
তৃষ্ণা
'চাকরির জন্য কেন? এমনি এমনিই খাওয়াবো।'
মা হাসলো। কিন্তু কিছু বললো না। তৃষ্ণা মাকে বললো-
'এ দোকানের রসমালাই খুব সুন্দর, জেঠিমা। আপনি বরং রসমালাই খান।'
তৃষ্ণা এবার দোকানদারের উদ্দেশে বললো-
'দাদা, আমাদের সবাইকে এক প্লেট করে রসমালাই দিন তো।'
দোকানের বেঞ্চে বসে, রসমালাই খেতে শুরু করলাম আমরা। সত্যি কথা বলতে কি, এত দৌড়ানোর পর বেশ খিদে পেয়েছিলো আমার। কাজেই রসমালাই পাওয়া মাত্র এক মিনিটে তা খেয়ে ফেললাম। তৃষ্ণা আমার পশে বসেছিলো। ও আমার দিকে চেয়ে হাসলো। আসলে ও বুঝলো, আমি বেশ ক্ষুধার্ত। তাই ও দোকানদারের উদ্দেশে বললো-
'দাদা, এনাকে আরও এক প্লেট রসমালাই দিন তো।'
আমরা ফৌজি মানুষ। আমরা দৌড়তে যেমন ভালোবাসি, খেতেও তেমনি ভালোবাসি। ডায়েটিং আমাদের কর্মও নয়। ধর্মও নয়। কাশ্মীরে, তিন কিলোমিটার উঁচু পাহাড় প্রতিদিন উঠানামা করি আমরা। তাও এক আধবার নয়। প্রতিদিন বেশ কয়েকবার। পেটে তখনই সয়, যখন পেশীতে সয়।
রসমালাই এলো। আবার খেতে শুরু করলাম আমি।
হটাৎ তৃষ্ণা আমার বাহু ছুঁয়ে আদুরে গলায় বললো-
'একটু বেশি করে খাও তুমি। নইলে, তোমার পেশী গুলো কমে যাবে।'
হেসে উঠলাম আমি। ওকে বললাম-
রসমালাই খেলে, পেশীর চেয়ে পেটে চর্বি জমবে বেশি।
তৃষ্ণা
'কেন, রসমালাইয়ে প্রোটিন নেই? '
আমি
রসমালাইয়ে, প্রোটিনের চেয়ে ফ্যাট অনেক বেশি।
দুষ্টু হাসি হেসে তৃষ্ণা আমাকে বললো-
'তাহলে, রসমালাই বেশি খেয়ো না তুমি।'
কথাটা বলেই, কিছুটা রসমালাই আমার প্লেট থেকে তুলে নিলো ও।
তৃষ্ণা এরকম। কোন লোক লজ্জা নেই ওর। কোন সঙ্কোচ নেই ওর। ও যা করতে চায়, ও তা নিঃসঙ্কোচে করে। সর্বসমক্ষে করে। ওর কোন গোপনীয়তা নেই। কোন ছলচাতুরী নেই। মা এজন্য তৃষ্ণাকে খুব ভালোবাসে।
হটাৎ মা তৃষ্ণাকে বললো-
'তুই আমাকে রসমালাই খাইয়েছিস, তোকে আমি পান্তুয়া খাওয়াবো।'
তৃষ্ণার হাত ধরে উঠে দাঁড়ালো মা। তারপর পেল্লাই সাইজের পান্তুয়াগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে মা দোকানদারকে বললো-
'আমাদের সবাইকে দুটো করে পান্তুয়া দিন তো।'
কাকীমা মাকে বললেন-
'একি, ঘরে গিয়ে লাঞ্চ করবো না আমরা? '
মা বললো-
'বাড়িতে গিয়ে রান্না করতে করতে, হজম হয়ে যাবে এগুলো।'
পান্তুয়া এলো। সেগুলোও খেয়ে ফেললাম আমরা। খাওয়া শেষে দেখলাম, মা মিষ্টি দোকানের সমস্ত বিল পেমেন্ট করলো। তৃষ্ণা মাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো-
'আপনি কেন জেঠিমা? '
মা হাসলো। কিন্তু কোন উত্তর করলো না। কাকু হাসতে হাসতে তৃষ্ণাকে বললেন-
'তোরা যতই লাফালাফি করিস না কেন, আমাদের ব্রিগেডের কমান্ডার তোর জেঠিমা।'
মা হাসলো। মা কাকুকে জিজ্ঞেস করলো-
'তো চৈতি তাহলে কি? '
কাকু
'ডেপুটি কমান্ডার।'
কাকীমা হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন-
'তো তুমি কি? '
কাকুও হাসতে হাসতে বললেন-
'আমি হাফ প্যান্ট পরা সিপাই! '
সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম আমরা। হাসতে হাসতে দোকান থেকে বেরিয়ে পথে নেমে এলাম আমরা।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem